মোবাইল সেবার ওপর কর বাড়ানো সরকারের ‘স্ববিরোধী’ সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে মোবাইল সেবার ওপর কর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছে সরকার, যার ফলে মোবাইল সেবা ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের খরচ আগের চেয়ে বাড়বে।

মোবাইল সেবায় সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যার ফলে ফোনে ১০০ টাকা রিচার্জ করলে সরকারের কাছে কর হিসেবে যাবে প্রায় ২৫ টাকা – যা এতদিন ছিল ২২ টাকার মত।

এর ফলে মোবাইল ব্যবহারকারীদের ফোনে কথা বলার খরচ তো বাড়বেই, মোবাইল ইন্টারনেটের খরচও বাড়বে।

সরকারের এই সিদ্ধান্ত এমন সময় এলো, যখন গত দুই মাসের বেশি সময় ধরে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে দেশের অধিকাংশ মানুষের স্বাভাবিক জীবন বিপর্যস্ত এবং ঘরে থেকে সময় কাটানোর জন্য ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীলতা অন্যান্য সময়ের চেয়ে অনেক বেড়েছে।

‘এই স্ববিরোধী সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তি নেই’
ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করা শাম্মা শাহরিন মার্চ মাসে সাধারণ ছুটি শুরু হওয়ার পরপরই ময়মনসিংহে পরিবারের কাছে চলে যান। এরপর ছুটির মেয়াদ বাড়তে থাকায় তার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাস নেয়ার সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

বাড়িতে ইন্টারনেট ও কম্পিউটারের সুবিধা না থাকায় ফোনের ইন্টারনেটের মাধ্যমেই অনলাইন ক্লাসগুলোতে অংশ নেন শাহরিন।

সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “একদিকে সরকার অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালানোর ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করছে, অন্যদিকে ইন্টারনেটের খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই স্ববিরোধী সিদ্ধান্ত কোন যুক্তিতে নেয়া হলো?”

শাহরিন জানান ক্লাসে অংশ নেয়া ছাড়াও ছুটির মধ্যে ঘরে থাকার জন্য মোবাইল এবং ইন্টারনেটের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন তিনি।

“ঘরে বসে পরিবার ও বন্ধুদের সাথে সময় কাটানোর জন্য দীর্ঘ সময় গ্রুপ ভিডিও চ্যাট করি। ঈদের সময় আত্মীয়দের বাসায় যেতে পারিনি বলে সবাইকে ভিডিও কল দিয়ে একসাথে সময় কাটিয়েছি। মোবাইল সেবার খরচ বাড়িয়ে দিলে আমার ঘরে থাকার খরচও তো বেড়ে যাবে।”

গত দুই মাসের সাধারণ ছুটি চলাকালীন সময় ক্লাস করা, বন্ধু-পরিবারের সদস্যদের সাথে আলোচনা করা ছাড়াও ঘরে থেকে নিজেদের ব্যস্ত রাখার জন্য ইন্টারনেটের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল হয়েছে মানুষ।

স্বামীর সাথে ঢাকায় থাকেন অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী রোকেয়া হাসিন। তার ছেলে-মেয়ে বিদেশে বসবাসরত রয়েছেন। অন্যান্য সময় বাসার আশেপাশে পরিবারের সদস্যদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করে বা সাবেক সহকর্মীদের সাথে সময় কাটাতেন তিনি।

কিন্তু গত দুই মাস ছুটির মধ্যে ঘর থেকে বের না হওয়ায় সময় কাটানোর জন্য মোবাইল ফোনের ওপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন তিনি।

তিনি বলছিলেন, “সবার সাথে ভিডিও কলে তো কথা হয়ই, এছাড়াও এই লকডাউনের মধ্যে আমার সময় কাটানোর অন্যতম প্রধান কাজ ছিল রান্নার ভিডিও দেখে নতুন নতুন রান্না করা।”

মোবাইলের খরচ বেড়ে যাওয়ায় এখন ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরো মিতব্যয়ী হতে হবে বলে দু:খপ্রকাশ করেন রোকেয়া হাসিন।

‘অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক নয়’
মোবাইলের মাধ্যমে পাওয়া সেবার ক্ষেত্রে সম্পূরক শুল্ক ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক হবে না বলে বিবৃতি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের মোবাইল টেলিফোন অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটব।

অ্যামটবের মহাসচিব এসএম ফরহাদ বলেন, “করোনাভাইরাসে প্রাদুর্ভাবের সময় মোবাইল ও ইন্টারনেটই যোগাযোগের মূল মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এরকম সময় এই করের বোঝা অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক হবে না।”

“এই অতিরিক্ত করের বোঝা দরিদ্র মানুষের জন্য অসহনীয় হয়ে পড়বে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পথে অন্তরায় হয়ে উঠবে। এর ফলে মোবাইল শিল্পখাত আরো দুর্বল হয়ে পড়বে।”

গ্রাহকদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ার ফলে মোবাইল কোম্পানিগুলোর ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং এর ফলে জিডিপি’তে মোবাইল খাতের অবদানও ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মি. ফরহাদ জানান।

Sharing is caring!