যেভাবে অসহায় পঙ্গু তামিমের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিলেন এসআই আজাদ

দেশের এই করোনা পরিন্থিতিতে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় এক শিশুকে দুপুরের খররোদে হেঁটে আসতে দেখে থামালেন চেকপেস্টের দায়িত্বে থাকা এসআই আবুল কালাম আজাদ।

খেয়াল করে দেখলেন ছেলেটি একটি পা নেই, তার ওপর করোনার প্রদুর্ভাবের মধ্যে কেন রাস্তায় বের হয়েছে জানতে চান তিনি।

স্ক্রেচে ভর করে দাঁড়িয়ে ছেলেটির কথা বলতে কষ্ট হচ্চিল দেখে তিনি তাকে বসালেন। নিজে বসলেন তার কাছে। শিশুটিকে অভয় দিয়ে কারণ জানতে চাইলেন।

শিশুটি জানায়, তার নাম তামিম, পাশেই এক জায়গায় ত্রাণ দেয়ার খবর পেয়ে সে গিয়েছিল। কিন্তু ত্রাণ পায়নি। তার বাবা ভ্যান চালাতেন, তিনি এখন অসুস্থ। গত কয়েকদিন ধরে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে তাদের।

এ কথা শুনে আর নিজে ধরে রাখতে পারেননি এসআই আজাদ। সঙ্গে সঙ্গে শিশুটিকে এব বস্তা চাল, আলু, ডাল তেলসহ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী কিনে ভ্যানে তুলে দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেন।

শিশুটিকে তার একটি ভিজিটিং কার্ড দিয়ে বলেন, বাসা থেকে বের হওয়ার দরকার নেই, চাল ফুরিয়ে গেলে আমাকে ফোন দেবে। আমি গিয়ে তোমার বাড়ি চাল পৌঁছে দিয়ে আসবো।

এক কথায় অসহায় পঙ্গু শিশুর দায়িত্ব নিলেন ফরিদপুরের ভাঙ্গা থানার এই এসআই। পাশে থেকে এলাকার কেউ একজন পুরো বিষয়টি মোবাইলে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আপ করে দেন।

সঙ্গে সঙ্গে ভাইরাল হয়ে যায় ওই ভিডিও ক্লিপ। তা ছড়িয়ে পড়ে ইউটিউবেও। দেশ-বিদেশে হাজারাও মানুষ পুলিশের ওই কর্মকর্তাকে তার এ মানবিক আচরণের জন্য প্রশংসায় ভাসাতে থাকেন।

পুশি কর্তকর্থার ওই মানবিকতায় উদ্ভূদ্ধ হয়ে এখন কেউ তার পড়াশোনার খরচ চালাতে চাইছেন, কেউ তাকে কৃত্রিম পা সংযোজনের অর্থ দিতে চাইছেন। অনেকেই এখন পাশে দাঁড়াতে চাচ্ছেন অসহায় পঙ্গু এ ছেলেটির।

মানবিকতার এক অনুকরনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ভাঙ্গা থানার ওই পুলিশ কর্মকর্তা। গত বুধবার (৬ মে) পঙ্গু শিশুর বাড়ি গিয়ে এক মাসের খাবার, চিকিৎসা, লেখাপড়াসহ সব খরচ দিয়ে আসেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সে ছবিও ছড়িয়ে পড়লে ভাইরাল হয়ে যায়। এক সৌদি প্রবাসী এসআই আজাদের এক বন্ধুও শিশুটির জন্য সাহায্য পাঠান।

এ প্রসঙ্গে ভাঙ্গা থানার এসআই আবুল কালাম আজাদ যুগান্তরকে বলেন, করোনা মোবাবেলায় গত ২৭ এপ্রিল দুপুরে আমি ভাঙ্গা ও নগরকান্দার সীমান্তবর্তী মুনসুরাবাদ এলাকায় মহাসড়কে চেকপোস্টের দায়িত্ব পালন করছিলাম।

তখন লাঠিতে ভর দিয়ে একটি পঙ্গু শিশু মুখ মলিন করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে তাকে ডেকে পাশে বসাই। এ সময় সে তার পরিবারের কথা বিস্তারিত আমাকে জানায়।

তার বাবা একজন ভ্যান চালক, বর্তমানে অসুস্থ, ঘরে চাল, ডাল নেই। সে ক্লাস টুতে পড়ে। ত্রাণের আশায় বাড়ি থেকে বের হয়েছিল, কেউ তাকে সাহায্য করেনি।

কয়েকদিন ধরে মা-বাবা, ২ ভাই ও ২ বোনের সঙ্গে অর্ধহারে-অনাহারে দিন কাটছে তার। তখন আমি নিজের বেতনের টাকা থেকে পঙ্গু শিশুকে চাল, ডাল, সবজি ও নগদ কিছু অর্থ তুলে দিয়ে বলি লকডাউন যতোদিন থাকবে তুমি ঘর থেকে বের হবে না।

আমাকে ফোন দিলে আমি তোমাদের বাড়িতে গিয়ে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দিয়ে আসবো। ওই দিনের ঘটনার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে এটি ভাইরাল হয়ে যায়। এটি দেখে আমার প্রবাসী এক বন্ধু এগিয়ে আসে এবং সে অসহায় পঙ্গু শিশুটির পড়ালেখার খরচ বহনসহ তার পঙ্গু পা টি কৃত্রিমভাবে স্থাপনের জন্য ব্যায় ভার বহনের আশ্বাস দেয়।

আমি কোন বাহবা পাওয়ার জন্য এ কাজ করিনি। এর আগে আমি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থানায় ছিলাম। সেখানে এক বৃদ্ধা অসুস্থ মাকে রাস্তায় ফেলে চলে গিয়েছিল। আমি তাকে উদ্ধারকরে হাসপাতালে ভর্তি করে সুস্থ করে আমার বাসায় রেখেছি।

লেখাপড়ার খরচ চালাতে না পেরে এক যুবক রিকশা চালাচ্ছিল। আমি তাকে একটি ভন্ডকালীন চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির খরচ দিয়েছি। এক বৃদ্ধাকে ঘর তুলে দিয়েছি।

এসবই করেছি নিজের মনের প্রশান্তি থেকে। এসব কাজ করে আমি অনেক মানসিক তৃপ্তি পাই। আল্লাহ যেন ভবিষ্যতেও অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ দেন।

এ ব্যাপারে ভাঙ্গা থানার অফিসার্স ইনচার্জ (ওসি) মো. শাফিকুর রহমান জানান, লকডাউনের কারণে মানুষ যখন গৃহবন্দি, তখন ভাঙ্গা থানা পুলিশ অসহায় হতদরিদ্রদের সাহায্যে ব্যাক্তিগত তহবিল থেকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।

গত ৫ মে আমরা ওই এলাকার হিজড়াদেরকে ত্রাণ দিয়েছি। প্রতিদিন গরিব ও অসহায়দের মাঝে ত্রান সামগ্রী বিতরণ করছি। এছাড়া এসআই আজাদসহ পুলিশের একটি টিম ৬ মে পঙ্গু শিশু তামিমের বাড়ি গিয়ে চাল, ডাল, মুরগী ও সবজি দিয়ে এসেছে এবং তার চিকিৎসা ও লেখাপড়ারসহ সব দায়িত্ব নিয়েছেন তারা।

এছাড়া, এসআই আজাদ ভাঙ্গার ৩ জন করোনায় আক্রান্ত রোগীর বাড়িতে ফল ও খাবার পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। করোনা প্রতিরোধে সচেতনতামূলক বিভিন্ন কার্যক্রমও পরিচালনা করে যাচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা।

Sharing is caring!