পেট তো ‘লকডাউন’ বোঝেনা! কি খাইয়া বাচমু কন?

পেট তো ‘লকডাউন’ বোঝেনা! কি খাইয়া বাচমু কন? সরকার দয়া কইরা আমাগো মুখের দিকে একটু চাইলে এই মহামারীতে পোলামাইয়া নিয়া দুই বেলা খায়া বাচতে পারতাম।

সাংবাদিকদের ক্যামেরা দেখে এভাবেই নিজের আক্ষেপ ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করলেন করোনা থাবায় কর্মহীন হয়ে পড়া রাজধানীর মিরপুর-২ নম্বর সেকশনের মন্দির সংলগ্ন কুসুমবাগ বস্তির বাসিন্দা হেমায়েত নামের এক রিক্সাচালক।

তার দাবি, সরকারি সকল নির্দেশনা মেনে চলতে গিয়ে সে আজ কর্মহীন। কিন্ত সংসার চালাতে জমানো অর্থ বলতে কিছুই নেই। নিজের রোজগারই ভরসা।

তাই ঘরে স্ত্রী সন্তানদেরকে নিয়ে খেয়ে না খেয়েই দিনপাত করতে হচ্ছে। সরকারি ত্রাণ পাবেন বলে আশায় বুক বেধে থাকলেও কোন ত্রাণসাহায্যই পাননি তারা।

মরণঘাতি করোনায় বিধ্বস্ত রাজধানীসহ গোটা দেশ। প্রতিদিন হু হু করে বেড়েই চলেছে করোনা আক্রান্তদের সংখ্যা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাসহ সমগ্র দেশের বিরাট অঞ্চল কার্যত লকডাউন।

করোনা সংক্রমণ রোধে দেশের আপামর জনগনের প্রতি দায়িত্বশীলতার সাথে বিশেষ জরুরী প্রয়োজন ছাড়া ঘরেই অবস্থান করার পাশাপাশি সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিশেষ আহ্বান জানিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট বিধিনিষেধও আরোপ করা হয়েছে। সরকার ষষ্ঠ দফায় সাধারন ছুটি বাড়িয়ে আগামী ১৬ মে পর্যন্ত ঘোষণা করেছেন।

এতে করে কর্মহীন হয়ে পড়ে অনাহারে অর্ধাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছে দেশের ১৮ কোটি জনগণের বিরাট এক অংশ।

সেদিকে লক্ষ রেখে সরকার চাহিদা অনুযায়ী রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও সরকারী বিভিন্ন দপ্তরের মাধ্যমে দুস্থ প্রতিটি মানুষের ঘরে ঘরে পৌছে দিচ্ছে ত্রাণসামগ্রী।

আসলে প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী প্রতিটি দুস্থ পরিবারের দরজায় ত্রাণসামগ্রী পৌছে দেওয়া সরকারের পক্ষে পুরোপুরি সম্ভব নয়।

তাছাড়া ইতোমধ্যে সরকারের বরাদ্দকৃত ত্রাণসামগ্রী সঠিকভাবে বন্টন না করে আত্মসাৎ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন অনেক জনপ্রতিনিধিরাই।

ফলে এই মহামারীতে সরকারের সরকারের নানা মুখী উদ্যোগ ফলপ্রসু না হওয়ার পাশাপাশি ম্লান হয়ে যাচ্ছে বিশেষ অর্জন।

ত্রাণের অভাবে চলতি সপ্তাহে মিরপুরে সড়ক অবরোধ, জনপ্রতিনিধিদের অফিস ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছে নানা শ্রেনী পেশার হাজার হাজার দুস্থ অভুক্ত জনগণ।

দেশের বিভিন্ন এলাকাতেও এমন ঘটনা অহরহই ঘটছে। অনেকে সেটিও করতে না পেরে পরিবার পরিজন নিয়ে অনাহারে অর্ধাহারে নিভৃতে ঘরে বসে চোখের জল ফেলছেন।

৭ মে (বৃহস্পতিবার) মিরপুর- ২ নম্বর সেকশনের মন্দির সংলগ্ন নাসিমবাগ বস্তিতে সরেজমিনে গিয়ে এমন চিত্রই দেখা গেছে। বস্তিটিতে প্রায় পাঁচশতাধিক অসহায়, দুস্থ, রিক্সাচালক, হকার, দিনমজুরের বসবাস।

লকডাউনে তারাও গৃহবন্দী। কর্ম নেই, নেই আয়। অনেকের ঘরেই জ্বলছে না চুলা। স্ত্রী সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন তারা।

সাংবাদিকদের দেখে প্রথমে দু’একজন এগিয়ে আসলেও একপর্যায়ে তাদের আক্ষেপ ও আর্জি জানাতে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন অনেকেই।

এসময় পপি আক্তার নামে কুসুমবাগ বস্তিটির গৃহপরিচারিকা এক বাসিন্দা বলেন, আমার স্বামী একজন ডাব বিক্রেতা আর আমি মাইনষের বাসায় বুয়ার কাম করি। অহন কোনো বাসায় কামেও নিতাছে না।

আমার স্বামীও দীর্ঘদিন ধইরা ঘরে বইসা থাকায় আমার ঘরে আজ রাইতের খাওনটুকু পর্যন্তও নাই। এমনিতেই পবিত্র রমজান মাস চলতাছে।

আমরা প্রাপ্তবয়স্করাও সেহরী ও ইফতার দুইবেলা খাইতে পারলেও শুকুর আলহামদুলিল্লাহ। তয় আমাগো মাসুম শিশু বাচ্চাগো নিয়াই বড় সমস্যা। বাবা-মা হিসেবে খাওনের অভাবে নিজের পেটের মাসুম অবুজ পোলাপাইনগো আহাজারি সহ্য করা বড় কষ্টের।

পেশায় রিক্সাচালক হেমায়েত নামে বস্তির অপর বাসিন্দা বলেন, পরিবারের ৪ জন সদস্য নিয়া বেজায় খারাপ দিনতপাত করতাছি। রাস্তায় লোকজন নাই।

তাছাড়া রিক্সা নিয়া রাস্তায় বাইর হইলে পুলিশও গাড়ি আটকায়া বাসায় ফেরত পাঠায়া দেয়। কিন্ত পেট তো লকডাউন বোঝেনা স্যার। কি খাইয়া বাচমু কন?

সরকার আমাগো দিক একটু চাইলে পোলামাইয়া নিয়া দুই বেলা খায়া বাচতে পারুম।

তাসলিমা নামে বস্তিটির বাসিন্দা অপর এক নারী বলেন, আমার স্বামী রিক্সা চালায়। সংসারে পাঁচজন মানুষের পেট তার পরিশ্রমের উপর দিয়াই চলে। সে মেলাদিন রিক্সা নিয়া বাইরেও যাইতে পারেনা।

খাইয়া না খাইয়া দিন কাটাইতাছি। কিন্ত আমাগো দুঃখের কথা কওনের মানুষ পাইনা? কার কাছে কমু? কে দয়া কইরা আমাগো দিকে সাহায্যের হাত বাড়াইয়া দিবো?

অতি সরলতায় নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আস্তে আস্তে ফের বললেন, আপনেরা তো সাংবাদিক। শুনছি আপনেগো কথা সরকার শোনে।

আপনেরা দয়া কইরা সরকারের কাছে একটুখানি আমাগো কথা কন স্যার। যাতে সরকার আমাগো দিকে একটু নজর দেয়। না হইলে পোলাপাইন লইয়া না খাইয়া মইরা যামু।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তোফাজ্জল হোসেন টেনুর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সম্প্রতি ওই বস্তিটির বাসিন্দা কুদ্দুস ও ফরিদকে সাথে নিয়ে এখানকাটর ৮৫ টি দুস্থ পরিবারের মাঝে ত্রাণসামগ্রী পৌছে দেয়া হয়েছে।

তবে সেগুলো আসলে পর্যাপ্ত নয় তা আমরাও জানি। যেহেতু বিষয়টি জানতে পারলাম সেহেতু দ্রুত সময়ের মধ্যে খোঁজখবর নিয়ে আমি সাধ্য মত সেখানে ত্রাণসামগ্রী পৌছে দেওয়ার চেষ্টা করবো।

Sharing is caring!