করোনায় মৃত্যুর প্রধান কারণ হাইপক্সিয়া

দেশে সংক্রমণ শুরুর প্রথম দিকে করোনা উপসর্গ নিয়ে মুগদা হাসপাতালে মারা যান সিটি ব্যাংকের কর্মকর্তা মুজতুবা শাহরিয়ার। তিনি ঘুমানোর আগেও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলেন। কিন্তু ভোর না হতেই তার মৃত্যুর সংবাদে সবাই হতবাক হয়ে যান।

সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন শোক জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লেখেন- ‘যে ছেলে রাতেও স্বাভাবিকভাবে কথা বলেছে, অফিসিয়াল আলাপ করেছে সে এভাবে মারা যায় কীভাবে?’

করোনাকালে অনেকেই এভাবে মারা যাচ্ছেন হঠাৎ করে; কোনো সংকেত না দিয়েই। মানুষ স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে বলতে হঠাৎ ঢলে পড়ছেন মৃত্যুর কোলে। হাসপাতালে নেয়ার আগে পথেই মৃত্যু ঘটছে অনেকের। চিকিৎসকরা বলছেন, করোনাভাইরাসে সংক্রমিতদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হাইপক্সিয়া বা অক্সিজেনের মাত্রা দ্রুত কমে যাওয়া।

রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে করোনা চিকিৎসায় সরাসরি নিয়োজিত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ খালেদ মো. ইকবাল যুগান্তরকে বলেন, সংক্রমণের ফলে দেহে অক্সিজেনের মাত্রা কমতে থাকে নীরবে। কোনো কিছু টের পাওয়ার আগেই রোগী মারা যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটাকে বলে হাইপক্সিয়া। করোনা আক্রান্ত বেশিরভাগ রোগী মারা যাচ্ছেন সিভিয়ার হাইপক্সিয়ায়।

যেভাবে হাইপক্সিয়া হয় : একজন চিকিৎসক বলেন, ৯ দিন ধরে জ্বর-কাশি নিয়ে ষাটোর্ধ্ব বয়সের এক রোগী বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। একদিন দুপুরে তার অল্প অল্প শ্বাসকস্ট শুরু হয়। এ অবস্থায় রোগীর আত্মীয় ডাক্তারকে ফোন করে বলেন, রোগীর অবস্থা আগের থেকে ভালো। গোসল করে দুপুরের খাবার খেয়ে এখন টিভি দেখছেন, হাসছেন, গল্প করছেন। তবে মাঝে মধ্যে শ্বাস নিতে একটু অসুবিধা হচ্ছে।

এমন উপসর্গের কথা শুনে চিকিৎসক বাসায় এসে দেখেন- রোগী হাসিমুখে স্বাভাবিক কথাবার্তা বলছে ঠিকই, কিন্তু তার ঠোঁট নীল হয়ে গেছে। মেপে দেখা গেল, অক্সিজেন লেভেল ৭০ এর নিচে নেমে গেছে। যেখানে থাকার কথা ৯৫। রোগীকে সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে হাসপাতালে নেয়া হয়।

কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছার পরপরই রোগীকে ভেন্টিলেটরে নিতে হয়। কেউ কেউ এটাকে সাইলেন্ট হ্যাপি হাইপক্সিয়া বলেন। অর্থাৎ রোগী অনেকটা হ্যাপি ও স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে। বুঝে উঠতে পারেন না তার অক্সিজেন কমে যাচ্ছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, অল্প কিছু পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে রাখলে হাইপক্সিয়াজনিত মৃত্যু অনেকাংশে রোধ করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে হাসপাতালেও নেয়ার প্রয়োজন নেই। বাসায় থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর মাপার মতো পালস অক্সিমিটার দিয়ে অক্সিজেন লেভেল প্রতি ঘণ্টায় পরীক্ষা করতে হবে। ৯৫ বা এর উপরে থাকলে স্বাভাবিক মাত্রা ধরা হয়। ৯০ পর্যন্ত নামলে তাকে মাইল্ড হাইপক্সিয়া বলে। এটা বিপদ শুরুর সংকেত।

আর ৯০ এর আরও নিচে নেমে গেলে মডারেট হাইপক্সিয়া বা রোগীর মাঝামাঝি বিপদ। তবে ৮০ এর নিচে নামলে সিভিয়ার হাইপক্সিয়া বা রোগীর চূড়ান্ত বিপদ সংকেত। এরকম হলে সময়টি চরম দুশ্চিন্তার। এ কারণে ৯৫ এর নিচে অক্সিজেন নামলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

চিকিৎসকরা বলছেন, অনেক করোনা রোগীর ক্ষেত্রে দেখা যায় বসে থাকার সময় অক্সিজেনের মাত্রা ঠিক থাকে। কিন্তু হাঁটাহাঁটি করলে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায়। এটা বোঝার জন্য রোগীকে ৪০ কদম হেঁটে অক্সিজেন লেভেল মাপতে হবে। হাঁটার পর যদি ৩ পয়েন্ট কমে যায় অর্থাৎ ৯৬ থেকে ৯৩ হয়ে যায়, তবে রোগীকে হাসপাতালে নিতে হবে। এছাড়া যাদের ফুসফুস বা হার্টের রোগ আছে তাদের অক্সিজেনের স্বাভাবিক মাত্রা ভিন্ন হয়ে থাকে।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের করোনাজয়ী চিকিৎসক আবদুল্লাহ আল হারুন যুগান্তরকে বলেন, বিশেষ করে বয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রে জ্বর হলেই করোনা হয়েছে ধরে নিয়ে সতর্কতা নিতে হবে। কারণ করোনায় একেবারে সাধারণ উপসর্গ দেখা যায়। প্রথমে জ্বর হয়। এরপর কারও কারও শ্বাসকস্ট দেখা দেয়। শ্বাসকস্ট দেখা দেয়া রোগীদের ক্ষেত্রেই জটিলতা, এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে। কারণ করোনায় রোগীদের সাইলেন্ট হ্যাপি হাইপক্সি হয়।

অর্থাৎ রোগী একেবারেই স্বাভাবিক থাকবে। কিন্তু অক্সিজেনের মাত্রা কমতে থাকবে, অথচ রোগী কিছুই টের পাবে না। কিন্তু যখন শ্বাসকস্ট শুরু হয় তখন অক্সিজেনের মাত্রা অনেক নেমে যায়। এ পর্যায়ে রোগী হাসপাতালে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে নিচে নামে। এরপর এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছোটাছুটি করতে থাকে। কিন্তু এ সময়ে যেহেতু সে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না, সেহেতু দেহের অভ্যন্তরে স্থায়ী ক্ষতি হয়ে যায়। লাংসের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে রোগীকে আইসিইউতে নিলেও খুব একটা লাভ হয় না।

তিনি বলেন, ফলে অক্সিজেন কমতে শুরু করলেই চিকিৎসা দিতে হবে। করোনাভাইরাসের যেহেতু এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা নেই, তাই রোগীকে অক্সিজেন দিতে হবে। এটিই মূল চিকিৎসা। এরপর ফুসফুসের ক্ষতি যেন না হয় সেজন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় ইনজেকশন দেয়া শুরু করতে হবে।

রোগীর শরীরে করোনার জীবাণু সংক্রমণের দিন থেকে ১৬ দিন পর্যন্ত থাকে। তবে প্রথম থেকে পরবর্তী ৮ বা ১০ দিন ঝুঁকিপূর্ণ সময়। এ সময়টাতে রোগীর মুখে রুচি থাকে না। জ্বর থাকে। এ কারণে প্রথম থেকেই সতর্ক হতে হবে। যথাসময়ে অক্সিজেন দিতে পারলে করোনায় মৃত্যুর ঝুঁকি নেই বললেই চলে।

Sharing is caring!