বৃষ্টি বাদলার দিন, করোনা আতঙ্কের মধ্যেই ফিরে এসেছে ডেঙ্গু জ্বরের আতঙ্ক

শুরু হয়েছে বৃষ্টি বাদলার দিন। বৃষ্টি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এডিস মশার বংশবিস্তার বৃদ্ধি পেয়েছে। আর তাই করোনা আতঙ্কের মধ্যেই ফিরে এসেছে ডেঙ্গু জ্বরের আতঙ্ক। ডেঙ্গু জ্বর থেকে রক্ষা পেতে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে এখন থেকেই।

ঢাকায় ডেঙ্গুর প্রথম প্রাদুর্ভাব ২০০০ সালে। সে বছরই প্রথম এডিস এজিপ্টি নামের মশাটির নাম শুনেছিল ঢাকাবাসী। প্রথম বছর আনুমানিক ৫ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা শহরে; মারা গিয়েছিল প্রায় ৯৩ জন। এরপর থেকে প্রতি বছরই বহু মানুষ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং অনেকেই মারা যাচ্ছেন। তাই ডেঙ্গু জ্বরকে অবহেলা করা যাবে না।

এই ঋতুতে যেহেতু এডিস মাশার উপদ্রব বেড়ে যায় এবং তা থেকেই ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হতে হয়, তাই এ সময় আমাদের একটু বেশিই সতর্ক থাকতে হবে।

ডেঙ্গু থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হল ব্যক্তিগত সতর্কতা এবং এডিস মশা প্রতিরোধ। এডিস মশার উপদ্রব কমাতে ঘরবাড়ি এবং বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন। সঙ্গে কিছু ছোটখাটো ঘরোয়া নিয়ম মেনে চলতে পারেন, তাতেও বর্ষাকালে মশা-মাছি দূরে রাখা সম্ভব।

এডিশ মশা প্রতিরোধে

স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়ে। ময়লা-দুর্গন্ধযুক্ত ড্রেনের পানি এদের পছন্দ নয়। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার ডিম পাড়ার উপযোগী স্থান যেমন : প্লাস্টিকের পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের ড্রাম, মাটির পাত্র, ডাবের পরিত্যক্ত খোসা, ফুলদানি, অব্যবহৃত কৌটা, কন্টেইনার, ব্যাটারির শেল, পলিথিন, চিপসের প্যাকেট, বাথরুমের কমোড, ঘরের অ্যাকুরিয়াম, ফ্রিজ বা এয়ার কন্ডিশনারের নিচে পানি জমিয়ে রাখবেন না।

এসবে জমে থাকা পানি তিন থেকে পাঁচ দিন পরপর ফেলে দিন। এতে এডিস মশার লার্ভা মারা যাবে।

বাড়ির বারান্দা বা ছাদের টবে বা পাত্রে যেন কোনো ধরনের পানি পাঁচ দিনের বেশি জমে না থাকে। বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড়, জঙ্গল, জলাশয় ইত্যাদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন।

বারান্দা বা ছাদবাগানে জলজ গাছ যেমন- শাপলা, পদ্ম, জলগোলাপ ইত্যাদি গাছ থাকলে সেসব গাছের টবের পানি যদি ঘন ঘন পরিষ্কার করা সম্ভব না হয় তবে জলজ গাছের টবে কিছু গাপ্পি মাছ ছেড়ে দিন। এই মাছ মশার লার্ভা খেয়ে পানি পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। তবে গাপ্পি মাছ থাকলেও এই ঋতুতে মাসে অন্তত ২ দিন জলজ গাছের টবের পানি পরিবর্তন করতে হবে।

মশার অত্যাচার থেকে রক্ষা পেতে দরজা ও জানালায় নেট ব্যবহার করতে পারেন। বিশেষ করে বাসায় শিশু থাকলে বর্ষাকালে অবশ্যই নেট ব্যবহার করুন। প্রয়োজনে মসকুইটো রিপেলন্ট স্প্রে, লোশন, কয়েলও ব্যবহার করা যেতে পারে।

রাস্তাঘাট, জলাধার, বাসাবাড়ি, হাসপাতাল, অফিস-আদালতের আনাচে-কানাচে সপ্তাহে অন্তত তিন দিন মশা নিধনের জন্য স্প্রে বা ফগিং করুন।

ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখুন সবসময়। ময়লা-আবর্জনা ফেলার পাত্র ঢেকে রাখুন। বাথরুম অযথা ভেজা রাখবেন না।

মশার উপদ্রব বাড়লে শুধু দিনে নয়, রাতের বেলাও সারা শরীরে মশা নিরোধক ক্রিম ব্যবহার করা যেতে পারে। দিনের বেলা নারিকেল তেলের সঙ্গে ন্যাপথলিন বা কর্পূর মিশিয়েও হাত ও পায়ে লাগাতে পারেন। মশা যেহেতু চামড়া ভেদ করে রক্ত পান করে, তাই চামড়ার ওপর ঘন এই তেল মশাকে প্রতিহত করতে সাহায্য করে। নারিকেল তেলের বদলে সরিষার তেলও ব্যবহার করা যেতে পারে। আর ন্যাপথলিন অনেক ভালো একটি কীটনাশক হওয়ায় তা মশা তাড়াতে আরও বেশি কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।

দিনের বেলা শিশুদের হাফপ্যান্টের বদলে ফুলপ্যান্ট বা পায়জামা পরিয়ে রাখুন।

ব্যালকনিতে বা জানালার পাশে তুলসী গাছ লাগাতে পারেন। এ গাছে এমন কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে যা এডিস মশাসহ সব ধরনের মশা তাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মশার হাত থেকে বাঁচতে প্রতিদিন সকাল এবং সন্ধ্যায় ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে রুমের ভেতর কর্পূর জ্বালিয়ে রাখুন। ২০ মিনিট পর দেখবেন মশা একেবারেই চলে গেছে।

কয়েক কোয়া রসুন থেঁতো করে নিন। তারপর সেটি খুব ভালো করে তিন কাপ জলে ফুটিয়ে নিন। জল ফুটে অর্ধেক হলে নামিয়ে ছেঁকে বোতলে ভরে রাখুন। ঠাণ্ডা হলে ঘরের কোণে স্প্রে করে দিন এই মিশ্রণ।

এডিস মশা সাধারণত দিনেই কামড়ায়। তাই দিনের বেলা ঘুমানোর সময়ও মশারি ব্যবহার করা জরুরি।

এডিস মশা সাধারণত সূর্যোদয়ের আধাঘণ্টার মধ্যে এবং সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের আধাঘণ্টা আগে কামড়াতে বেশি পছন্দ করে। এ সময়ে মশার কামড় থেকে বাঁচতে সাবধানে থাকুন।

ডেঙ্গু হলে করণীয়

ডেঙ্গু জ্বরের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। তবে এ সময় প্রচুর পরিমাণে তরলজাতীয় খাবার যেমন ডাবের পানি, লেবুর শরবত, ফলের জুস এবং খাওয়ার স্যালাইন খাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। এমন নয় যে শুধু প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতে হবে, সঙ্গে তরল খাবারও গ্রহণ করতে হবে। জ্বর কমানোর জন্য কোনো মতেই প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য ওষুধ খাওয়া যাবে না। আর অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

Sharing is caring!