মাশরাফি বললেন, যা ব্যাটিং কর; টেনে ধরেও তামিমকে সেদিন আটকাতে পারেননি স্টিভ রোডস

শনিবার ইন্সটাগ্রামে ঘন্টাখানেক আড্ডায় মেতে উঠেন দেশের ক্রিকেটের দুই অভিজ্ঞ ক্রিকেটার তামিম ইকবাল ও মুশফিকুর রহিম। এক পর্যায়ে তামিমের সেই অবিশ্বাস্য সাহসিকতার পেছনের গল্পটি জানতে চান মুশফিক।

বন্ধু তামিম ইকবালের কাছে মুশফিকুর রহিমের আবদার, ‘আমি জানি তুই অনেকবারই বলেছিস। তারপরও ইচ্ছে আরেকবার শোনার।’

‘আমরা এশিয়া কাপে দুবাইয়ে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে জিতলাম। আমি তো মাঠে ছিলাম, তুই ড্রেসিং রুমে গেলি (রিটায়ার্ড হার্ট হয়ে)। যাওয়ার পর তোর মানসিকতা, হাসপাতাল থেকে ফিরে আসা, কি এমন ফিল হলো, এত বড় রিস্ক কেন নিলি?’

২০১৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর, দুবাইয়ের সেই ম্যাচ এখনও ফিরে ফিরে আসে ভক্তদের মনে। আগে ব্যাট করতে নেমে লাসিথ মালিঙ্গার প্রথম ওভারেই দুই উইকেট পড়ে যাওয়া। সুরঙ্গা লাকমলের করা পরের ওভারের এক বাউন্সারে কবজিতে আঘাত পেলেন তামিম। যেতে হলো হাসপাতালে।

এরপর তো অবিশ্বাস্য ফিরে আসা টাইগারদের। মুশফিক খেললেন ১৪৪ রানের ইনিংস। বাংলাদেশ পেল ২৬১ রানের পুঁজি। ম্যাচ জিতে নিল ১৩৭ রানের বিশাল ব্যবধানে। তবে তামিম সেদিন ভাঙা হাত নিয়ে ফের মাঠে না নামলে এর কিছুই যে হয় না!

৪৬.৫তম ওভারে নবম উইকেট পড়ে যায় টাইগারদের। স্কোর বোর্ডে তখন ২২৯। সবাই যখন ওখানেই শেষ ধরে নিচ্ছে, ঠিক তখন বিস্ময় উপহার দিয়ে ভাঙা হাতে মাঠে নেমে এলেন তামিম। এক হাতেই লাকমলের শর্ট বলটা সামলালেন। এরপর মুশফিকের ব্যাট হয়ে উঠল খাপ খোলা তলোয়ার। ১৫ বলে যোগ করলেন আরো ৩২ রান।

তামিমের ওই বীরত্বের পর বোলারদের প্রেরণা পেতে আর কিছু প্রয়োজন পড়েনি। লঙ্কান ব্যাটাররাও তাই লড়াইটাও জমাতে পারেনি।

সেই দিনের ঘটনা যখন জানতে চান মুশফিক, তখন বন্ধুকে হাসপাতালে যাওয়া থেকে ফিরে আসা, মাঠে নামার পরিকল্পনা সবকিছুই খুলে বলেন তামিম।

‘আমি যখন হাসপাতালে যাচ্ছিলাম, নিয়মিত মোবাইলে স্কোরটা দেখতে ছিলাম। আমাদের দুই তিনটা উইকেট তাড়াতাড়ি পড়ে গেল। তোর (মুশফিক) আর মিথুনের ভালো জুটি হলো। এটা আমি ডক্টরের কাছে ঢোকার আগ পর্যন্ত পরিস্থিতি। ’ মুশফিককে বলছিলেন তামিম।

এরপর তামিম হাসপাতাল থেকে ফিরলেন মাঠে, ‘আমি যখন আবার অ্যাম্বুলেন্সে করে মাঠে ফেরত আসছি, তখন আবার দুই তিনটা উইকেট পড়ে গেল। যখন ড্রেসিং রুমে ঠুকলাম দেখলাম তুই ব্যাটিং করছিস। এখানে (ড্রেসিং রুমে) কোনোভাবে চলছে আরকি। ’

‘তখন কথা বলতে বলতেই মাশরাফী ভাই বললেন যা ব্যাটিং কর। আমি প্রথমে ফাইজমালি হিসেবে নিয়েছি…। আমাদের ফিজিও বলছিল পাগল নাকি। ’ বলছিলেন তামিম।

মুশফিক গভীর আগ্রহে শুনে যান সব। তামিম থামেন না, ‘আলোচনা করতে করতেই দেখি তুই মারা শুরু করেছিস। এক শ’র কাছাকাছি হয়ে গেছে। তখন এই আলোচনা করতে করতে দেখি সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছে। আমরা বোঝাপড়ায় আসলাম যে, যদি মুশফিক স্ট্রাইকে থাকে তাহলে আমি যাবো। কারণ আমাকে ডাক্তার বলেছিল ওটা নিয়ে দৌড়ানোও যাবে না। তাই আমি বলেছি যে আচ্ছা যদি মুশফিক স্ট্রাইকে থাকে তাহলে সমস্যা নেই…। ’

কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু হলো না। ৪৭তম ওভারের পঞ্চম বলে রান আউট হয়ে গেলেন মোস্তাফিজ। তামিম বলেন, ‘দুর্ভাগ্য বসত চার নম্বর না পাঁচ নম্বর বলে মোস্তাফিজ আউট হয়ে গেল। ’

‘আমাদের সবার জীবনে কখনো কয়েক সেকেন্ডের জন্য এমন কিছু হয়, বা এমন কিছু কাজ করে যে সে নিজেও জানে কী করতে যাচ্ছে। ওই পাঁচ সেকেন্ড আমার সেটাই ছিল। ’

কিন্তু তামিম ব্যাট হাতে নিতেই থামাতে যান কোচ স্টিভ রোডস, ‘আমি ব্যাটটা হাতে নিয়েছি, স্টিভ রোডস দৌড়ে এসে আমাকে থামায়…। বলে, এটা আমাদের পরিকল্পনায় নেই। আমি বলি চিন্তা করো না আমি সামলাতে পারব। ’

‘তখন ও আমাকে বলেছে তাহলে এটা তোমার দায়িত্ব। আমার কাছে মনে হয় ওই ইমোশনের মধ্যে আমি বলটা খেলতে পেরেছি। ’– বলেন তামিম।

লাকমল যে বলটা সেদিন করেছিলেন সেটিকে সবচেয়ে সহজ বল হিসেবে উল্লেখ করে তামিম বলেন, ‘ও যদি আমাকে ইয়র্কার করত বা উইকেটে বল করতো তাহলে আমার জন্য কঠিন হয়ে যেত। ’

পরম সাহসিকতা নিয়ে তামিম বলটি খেললেন। এরপর মুশফিকের তাণ্ডব। কিন্তু ব্যথায় মুশফিকের ব্যাটিংয়ের কিছুই মনে রাখতে পারেননি তামিম।

মুশফিককে বলছিলেন, ‘সত্যি কথা আমার সব স্ট্যাটস মনে থাকে। সবার ইনিংস মনে থাকে। শুধু তোর ওই ইনিংসটা আমার মনে নেই। কারণ আমি এতটা ব্যথায় ছিলাম আর তুই চার-ছক্কা মারছিল কিছুই মনে রাখতে পারিনি। ’

Sharing is caring!